বদর যুদ্ধ!


 যুদ্ধ আসন্ন দেখিয়া হযরত মদিনাবাসীদিগকে অস্ত্র ধারণ করিতে আহ্বান করিলেন ।

ইতিপূর্বে যে সনদপত্র স্বাক্ষরিত হইয়াছিল, তাহার একটি শর্তে এই ছিল যে, বহিঃশত্রুর

দ্বারা যদি মদিনা আক্রান্ত হয়, তবে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলে মিলিয়া দেশরক্ষা

করিবে। কিন্তু হযরত পরিষ্কার বুঝিতে পারিলেন ইহুদী ও খ্রিস্টানদিগের মধ্যে সে

মনােভাব আদৌ নাই, বরং তাহাদের ভাবে ভঙ্গিতে ও আচরণে এই কথাই সুস্পষ্ট হইয়া

উঠিতেছে যে, কোরেশগণ মদিনা নগরী আক্রমণ করিয়া নব জাগ্রত মুসলিম শক্তিকে

ধ্বংস করিয়া দিলেই তাহারা খুশি হয়। শুধু তাহাই নহে, তাহারা যে তলে তলে

কোরেশদিগের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে, এই সংবাদও হযরতের অজানা রহিল না ।

হযরত ইহাতে দমিলেন না। বুঝিলেন মুসলমানদিগকে দুই সীমান্তেই যুদ্ধ করিতে

হইবে। তবে উভয় শত্রুকে একযােগে ক্ষেপাইয়া দেওয়া বুদ্ধিমত্তার কাজ হইবে না ।

ইহাই ভাবিয়া তিনি সর্বপ্রথম কোরেশদিগকে দমন করিতেই বদ্ধ পরিকর হইলেন ।

এই উদ্দেশ্যে নবীজী আপন ভক্তবৃন্দকে এক পরামর্শ সভায় আহবান করিরেন ।

সমর পরিস্থিতির আলােচনা করিতে গিয়া তিনি বুঝাইয়া দিলেন, আবুসুফিয়ানকে

অস্ত্রশস্ত্রসহ সিরিয়া হইতে নির্বিঘ্নে মক্কায় ফিরিয়া যাইবার সুযােগ দিলে বিপদ আরও

ঘনীভূত হইবে। তকালে মক্কা হইতে সিরিয়া যাইতে হইলে বদরের গিরিপথ দিয়া

যাইতে হইত । বদর ছিল মক্কা মদিনা ও সিরিয়ার রাজপথের সন্ধিস্থল এবং মদিনার

এলাকাধীন। কাজেই মদিনার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য মদিনার মধ্য দিয়াই শত্রুর

মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র রসদপত্র লইয়া দেশে ফিরিবে, অথচ মদিনাবাসী তাহাতে বাধা দিবে

, ইহার নাম নিজেদের মৃত্যু পরােয়ানায় দস্তখৎ ছাড়া আর কিছু নহে। দুই দেশ যখন

যুদ্ধাবস্থায় (State of the belligerency) আসিয়া যায়, তখন এইরূপ ব্যাপার

সংঘটিত হইতে দেওয়া কিছুতেই আর সম্ভব হয় না। কোন আন্তর্জাতিক নীতিই ইহা

সমর্থন করে না। রসূলুল্লাহ্ তাই মনস্থ করিলেন সিরিয়া হইতে রণসম্ভারসহ ফিরিবার

পথে বদর প্রান্তরে আবুসুফিয়ানকে বাধা দিয়া তাহার অস্ত্রশস্ত্র কাড়িয়া লইবেন। তিনি

উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলেন, আঘাতের প্রতিঘাত করিয়া আত্মরক্ষা করা সব সময়

নিরাপদ নহে। আক্রমণ অনেক সময় শ্রেষ্ঠ আত্মরক্ষা।

এই ব্যাপারই পরামর্শ সভায় আলােচিত হইল। রসূলুল্লাহ্ সকলের মতামত জিজ্ঞাসা করিলেন। আবুবকর ও আলি রসূলুল্লাহ্র কথায় সায় দিয়া বলিলেন ঃ কালবিলমব না

করিয়া বদর প্রান্তরে অভিযান করা উচিত। আল- ন-মিকদাদ নামক সাহাবী উঠিয়া

দাঁড়াইয়া বলিলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ্, আল্লাহর নির্দেশে আপনি যেখানে খুশি চলুন,

আমরা আপনার সঙ্গে যাইব। হযরত মুসার শিষ্যদিগের ন্যায় আমরা এই কথা বলিব না,

হে মুসা, তুমি আর তােমার প্রভু গিয়া যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসিয়া থাকি। আমাদের

কথা হইতেছে ও আল্লাহর নামে আপনি যুদ্ধে চলুন, আমরাও আপনার সঙ্গে যুদ্ধে যাইব।

এই কথায় রসূলুল্লাহ্ উৎসাহবােধ করিলেন ।

অতঃপর আনসারদিগের প্রতি চাহিয়া তিনি তাহাদের মনােভাব জানিতে চাহিলেন।

তখন আনসার-নেতা সাদবিন মা'জ উঠিয়া বলিতে লাগিলেন ঃ “হে রসূলুল্লাহ্,

আনসারদিগের সম্বন্ধে চিন্তা করিবেন না। জীবনে-মরণে সুখে-দুঃখে ছায়ার ন্যায় আমরা

আপনাকে অনুসরণ করিব। আপনি যেখানে যাইতে বলিবেন সেখানেই যাইব, যেখানে

থামিতে বলিবেন সেখানেই থামিব । সাগরে ঝাপ দিতে বলিলে সাগরে ঝাঁপ দিব, ডুবিতে

বলিলে ডুবিব, মারিতে বলিলে মারিব।”


শিষ্যদিগের এই মনােবল দেখিয়া হযরত যারপর নাই আশান্বিত হইলেন। অবিলম্বে

অভিযানের জন্য তিনি প্রস্তুত হইতে লাগিলেন।

কিন্তু তবু শিষ্যদিগের মধ্যে কিছুটা মতবিরােধ দেখা দিল। অনেকে বলিলেন,

মদিনা নগরে যখন ইহুদী, নাসারা ও অন্যান্য গৃহশত্রু বিদ্যমান তখন সমস্ত মুসলমানের

একযােগে নগর ত্যাগ করিয়া যাওয়া কিছুতেই যুক্তিসঙ্গত হইবে না। হযরত দেখিলেন

কথাটির মধ্যে সত্য আছে। তখন তিনি মুসলমানদিগকে দুই দলে বিভক্ত করিলেন ।

যাহারা মদিনার থাকিবার পক্ষপাতি ছিলেন তাঁহাদিগকে মদিনাতেই রাখিয়া দিলেন আর

যাহারা অভিযানে যাইতে ইচ্ছুক হইলেন, তাঁহাদিগকে লইয়াই তিনি একটি স্বেচ্ছাবাহিনী

গঠন করিলেন। এইরূপ যিন্দাদিল দুঃসাহসিক মুসলিম বীরের সংখ্যা মিলিল মাত্র ৩১৩

জন; তাহাদেরও আবার অস্ত্রশস্ত্র নিতান্ত মামুলি ধরনের। অশ্বারােহী সৈন্য মাত্র দুইজন।

আর যানবাহনের জন্য পাওয়া গেল মাত্র ৭০টি উট ।

এই ক্ষুদ্র বাহিনী লইয়াই হযরত আজ বাহির হইলেন সেনাপতির বেশে। আজ

তাঁহার বীরমূর্তি। হাতে নাঙ্গা তলােয়ার। শিরে বাঁধা আমামা । রাত্রির অন্ধকারে নিঃশব্দে

তাঁহারা গৃহত্যাগ করিলেন। নিজেদের গতিবিধি গােপন রাখিবার জন্য উটের গলার

ঘণ্টাগুলি কাটিয়া দেওয়া হইল। মুষ্টিমেয় এই সত্যের সৈনিকদল নীরবে বদর অভিমুখে

যাত্রা করিলেন।

ইসলাম আজ সর্বপ্রথম দৃপ্ত তেজে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইল। তাহার প্রচ্ছন্ন রণমূর্তি

আজ জগতে আত্মপ্রকাশ করিল। তুমি অন্যায় করিয়া আমার গালে চড় মারিলে, আর

আমি তােমার দিকে অন্য গালটি ফিরাইয়া দিব, ইসলাম তাহা নহে। দুনিয়ার ঝঞাট

ঝামেলা হইতে নিরাপদে থাকিবার জন্য সন্ন্যাসী সাজিয়া বনে যাইব, ইসলাম তাহাও

নহে। ইসলাম জীবনের ধর্ম । আত্মবিলুপ্তি পশ্চাদপসরণ তাহার বাণী নহে। নিস্ক্রিয় 


প্রতিরােধ বা হিলরতও তাহার মূলনীতি নহে কৌশলমার। প্রয়ােজুন হইলে

সাময়িকভাবে অত্যাচার সহ্য করিতে হয়, অথবা হিযরত করিয়্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ

স্থানে গিয়া উদ্দেশ্য সাধনের নৃতন পথ খুঁজিতে হয় । হিযরতের অর্থ তাই পলায়ন বা

অগােপন নহে

সথানের ইহা এক কৌশলমাত্র । ইসলাম মূলত সংগ্রামের ধর্ম ।

সংগ্রাম করিয়া অগ্রসর হও ইহই তাহার বাণী । যালিমকে বাধা দাও, মযলুমকে রক্ষা

ইহাই ইসলাম ।

কর, সত্য ও আদর্শের জন্য তরবারি ধর প্রয়ােজন হইলে নার

আত্মরক্ষার জন্য,

ইসলামের তরবারি তাই নিরপরাধকে আগত করিবার জন্য নহে।

ন্যায় নীতি ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য, অন্যায়ের যথাযােগ্য প্রতিকারের জন্য। জীবন

বিমুখিতা, কাপুরুষতা বা ভীরু হৃদয়ের মিনতি ইসলামে নাই । ইসলাম বলিষ্ঠ ধর্ম –

স্বভাবের পটভূমিতে তাহ্যর প্রতিষ্ঠা। স্বভাবে যাহা আছে ইসলামেও তাহা আছে ।

এই মহাসত্যকেই রসূলুল্লাহ আজ প্রথম রূপ দিলেন। এতদিন তাহার এক হাতে

ছিল কোরআন, অপর হাত ছিল শূন্য। সেই শূন্য হাতে এবার তুলিয়া লইলেন তরবারি ।

এক হাতে কোরআন, অপর হাতে তলােয়ার মানুষের এই মহিমাময় মূর্তি দেখিয়া

কোন অর্বাচীন ইহাকে নিন্দা করে? ইহার চেয়ে তাহার সুন্দর মূর্তি আর কি হইতে পারে?

সত্যের সহিত শক্তির এই যে মিলন – ইহ্য কি ঘৃণার? ইহা কি নিন্দার? কিছুতেই নহে ।

শক্তি ছাড়া সত্য দাঁড়াইতে পারে না। পক্ষান্তরে শক্তি যদি সত্যাশ্রয়ী না হয়, তাহা হইলে

মানুষের অশেষ দুর্গতি ও অকল্যাণ ঘটে। সত্যহীন শক্তি যুলুমে রূপান্তরিত হয়।

জগতের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য সত্য ও শক্তির সমন্বয়ের তাই একান্ত প্রয়ােজন। ইহাতে

শক্তি সুনিয়ন্ত্রিত হয়, সত্যও উন্নত শিরে তাহার পথ কাটিয়া চলে । প্রত্যেক মানুষের

জীবনে তাই সত্য ও শক্তির যুগপৎ সাধনা । সত্যের আলাে যদি আমাকে পথ দেখায়,

সকল মিথ্যা সকল ভ্রান্তি সকল অসুন্দর হইতে সে যদি আমাকে বাঁচাইয়া চলে, সঙ্গে

সঙ্গে আমার তরবারি যদি আমাকে দেয় সকল বাধা-বিঘ্নকে জয় করিবার বিপুল প্রেরণা;

সকল ভীরুতা, দুর্বলতা দূর করিয়া সে যদি দেয় আমার অন্তরে অসীম সাহস ও

মনােবল, তবে আমার ভয় কি? লক্ষ্যস্থলে আমি পৌছবই ।

ইসলামের সহিত তরবারির এমনই সম্বন্ধ ।

কোরআন ও তরবারি তাই আদৌ অসামঞ্জস্য নহে । দুই বিরুদ্ধশক্তির সমন্বয়ই ত

ইসলাম ।

বস্তুত ইসলাম মুসলমানকে দুইটি বস্তুই দান করিয়াছে ও একটি কোরআন, অন্যটি

তলােয়ার । সত্য ও শক্তি, দীন দুনিয়ার দুই চমৎকার প্রতীক এই কোরআন ও তলােয়ার।

ইহাই মুসলমানের সাচ্চা চেহারা ইহাই তাহার সংক্ষিপ্ততম পরিচয় ।

তাই এক হাতে তলােয়ার। অপর হাতে কোরআনধারী মুসলিমকেই আমরা সারা

প্রাণ দিয়া কামনা করি ।

হযরত মুহম্মদকে আমরা দেখিলাম আজ এই আদর্শ মুসিলম বেশে। এই বেশেই

বীর নবী চলিলেন যুদ্ধ অভিযানে । রসূলুল্লাহ্ প্রথমত মক্কার পথ ধরিয়া চলিলেন, কিন্তু কিছুদূর গিয়া বদরের দিকে মুখ

ফিরাইলেন।

দুইদিন চলিবার পর তৃতীয় দিন সন্ধ্যাকালে হযরত সদলবলে বদর গিরি প্রান্তরে

আসিয়া উপনীত হইলেন।

বদর গিরি উপত্যকার তিনদিকে ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়। পূর্বদিকের একটি পাহাড়

হইতে একটি ঝর্ণাধারা নিম্নভূমির উপর দিয়া প্রবাহিত হইতেছিল। অভিজ্ঞ সাহাবাদিগের

পরামর্শে হযরত সেই ঝর্ণার মুখ দখল করিয়া ঘাঁটি গাড়িলেন। একটি টিলার উপর খর্জুর

শাখা ও পত্রাদির দ্বারা হযরতের জন্য একটি ছাউনি প্রস্তুত করা হইল। সেই ছাউনির

মধ্যে হযরত রাত্রি যাপন করিলেন। সাদ বিন মা'জ সারা রাত্রি সে ছাউনি পাহারা

দিলেন।

সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিক হইলে সকলে আত্মগােপন করিয়া আবুসুফিয়ানের প্রতীক্ষায়

রহিলেন। মাঝে মাঝে দুই একজন সাহাবী নিম্নে নামিয়া ছদ্মবেশে এদিক ওদিক গিয়া

খোঁজ-খবর লইতে লাগিলেন।

কিন্তু আবুসুফিয়ানও কম ধুরন্ধর ছিল না। সিরিয়া হইতে ফিরিবার পথে বদরের

সন্নিকটে আসিয়াই সে অত্যন্ত সতর্কতার সহিত অগ্রসর হইতে লাগিল । সে ছিল একজন

পাকা গােয়েন্দা। বদর সীমান্তে পদার্পণ করিবার পূর্বেই তাহার সন্দেহ হইল হয়ত বা

মদিনাবাসীরা বদরে আসিয়া এবার তাহাকে বাধা দিবে । এই আশঙ্কায় সে গােয়েন্দাগিরি

শুরু করিল। একটি বাজারের সন্নিকটে দুইটি উটের পদচিহ্ন দেখিতে পাইয়া সে তাহার

অনুসরণ করিতে লাগিল। কিছুদূর অগ্রসর হইয়া উটের খানিকটা শুষ্ক বিষ্ঠা দেখিতে

পাইল। সেই বিষ্ঠা তুলিয়া ধৌত করিয়া সে দেখিল তাহার ভিতর যে খেজুরের আঁটি

রহিয়াছে তাহা আকারে ছােট। বলা বাহুল্য, মদিনায় যে খেজুর হয় তাহার আঁটি মক্কার

খেজুরের আঁটি অপেক্ষা অনেক ছােট; কাজেই সুফিয়ানের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মিল যে, এই

অঞ্চলে মদিনার লােকেরা ঘােরাফেরা করিতেছে। এই ইঙ্গিত পাইয়াই আবুসুফিয়ান

বদরের পথ ছাড়িয়া দিয়া তাহার কাফেলাকে অন্য পথে পরিচালিত করিল। সঙ্গে সঙ্গে

জমজম নামক জনৈক কোরেশদূতকে দ্রুতগামী এক উটে মক্কায় পাঠাইয়া দিল। দূত

গিয়া আবুযহলকে এই জরুরী খবর দিল যে, আবুসুফিয়ানের কাফেলাকে হামলা করিবার

জন্য মুহম্মদ সসৈন্যে বদরে উপস্থিত। মক্কা হইতে যথেষ্ট সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র ও রসদপত্র না

পাঠাইলে আবুসুফিয়ানের আর রক্ষা নাই।

সংবাদ পাওয়া মাত্র আবুযহল ব্যস্তত্রস্তভাবে মক্কাবাসীকে আহ্বান করিয়া এই বিপদ

সংবাদ জানাইল এবং তৎক্ষণাৎ যুদ্ধসজ্জায় সজ্জিত হইয়া আসিবার জন্য সকলকে

আহ্বান করিল। আবুসুফিয়ানের স্ত্রী রণরঙ্গিণী হিন্দা স্বামীর অমঙ্গল আশঙ্কায় সিংহীর

ন্যায় গর্জিয়া উঠিয়া আপন পিতা ওবা, চাচা শায়বা, ভ্রাতা অলিদ ও অন্যান্য বীর-

পুরুষদিগকে যুদ্ধ যাত্রার জন্য অনুপ্রাণিত করিতে লাগিল। নাখলায় নিহত ও বন্দী

কোরেশদিগের আত্মীয় স্বজনও উৎসাহের সঙ্গে সেনাদলে আসিয়া যােগ দিল।  মদিনাবাসীদের দুঃসাহস ও স্পর্ধাকে দমন করিতেই হইবে, ইহা হইল তাহাদের দৃঢ়

পণ। অনতিবিলম্বে প্রায় এক হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠিত হইয়া গেল।

তন্মধ্যে ১০০ অশ্বারােহী, ৭০০ উষ্টারােহী ও অবশিষ্ট পদাতিক। এই সেনাবাহিনীর

পরিচালক হইল সত্তর বৎসর বয়স্ক কোরেশ নেতা আবুযহল ।

দ্বিগুণবেগে কোরেশবাহিনী বদর অভিমুখে অগ্রসর হইল । অর্ধপথ অতিক্রম করিবার

পর আবুসুফিয়ানের দ্বিতীয় দূত আবুযহলের নিকট এই খবর লইয়া আসিল যে, আবু

সুফিয়ানের কাফেলা মুহম্মদের লােক-লস্করকে এড়াইয়া নিরাপদ স্থানে পৌছিয়াছে।

এখন সে অন্য পথ দিয়া মক্কায় ফিরিয়া যাইতেছে। কাজেই মক্কা হইতে আর সাহায্য

পাঠাইবার কোন প্রয়ােজন নাই।

এই সংবাদ কোরেশ বীরদলে অনেকেই নিরুৎসাহ হইয়া পড়িল। অনেকে ফিরিয়া

যাইতে মনস্থ করিল। কিন্তু আবুযহল প্রমুখ নেতৃবৃন্দ অন্যরূপ যুক্তি দেখাইল। তাহারা

বলিল, আমরা যখন এত কষ্ট করিয়া বদরের কাছাকাছি আসিয়া গিয়াছি, তখন

মদিনাবাসীদিগকে শায়েস্তা না করিয়া যাইব না। মুহম্মদের সঙ্গে কতই বা লােক-লস্কর

আছে? অস্ত্রশস্ত্রই বা তাহাদের এত কী? যুদ্ধই বা কয়জন জানে? কাজেই এ সুযােগ ছাড়া

যাইবে না। এখান হইতে ফিরিয়া গেলে সকলেই আমাদিগকে কাপুরুষ বলিবে । আমরা

তাই কিছুতেই ফিরিব না। আমাদের সঙ্গে নর্তকী আছে, গায়ক গায়িকা আছে। আমরা

বরং বদরে গিয়া আবুসুফিয়ানের নিরাপত্তা ও রণ চাতুর্যের জন্য আনন্দোৎসব করিব।

আর মুহম্মদ ও তাহার লােক-লস্করকে আমরা যে পরাজিত করিব, ইহা ত সুনিশ্চিত।

ইহা ভাবিয়া কোরেশগণ দ্বিগুণ উৎসাহে বদর পানে অগ্রসর হইল। গ্রীষ্মকাল।

রমজান মাস। কোরেশগণ হাঁপাইতে হাঁপাইতে বদরে আসিয়া উপনীত হইল । পানির

সন্ধানে কতিপয় সৈন্যকে সামনে অগ্রসর হইবার জন্য আবুযহল আদেশ দিল ।

কয়েকজন লােক ঘুরিয়া ফিরিয়া ঝর্ণার ধারে আসিয়া যেই পানি খাইতে নামিয়াছে।

অমনি বীরবর হামজা গুপ্তস্থান হইতে তাহার দল লইয়া সেই লােকগুলিকে আক্রমণ

করিলেন। হামজা নিজেই কোরেশদের সর্দারকে হত্যা করিলেন। কয়েকজন বন্দী হইল

এবং একজন পলাইয়া গিয়া আবুযহলকে এই সংবাদ দিল। আবুযহল বিচলিত হইয়া

উঠিল। তাহারা যে শত্রু সৈন্যের এত কাছাকাছি আসিয়া পৌছিয়াছে, ভাবিতেই পারে

নাই। কোরেশদলে তখন সাজ সাজ রব পড়িয়া গেল। দ্রিম দ্রিম রবে রণদামামা বাজিয়া

উঠিল ।

মুসলিমদের মনের অবস্থা তখন যে কিরূপ, তাহা একটু চিন্তা করিলেই অনুমান করা

যায়। অকস্মাৎ এমন পটপরিবর্তন ঘটিবে, কে জানিত? রসূলুল্লাহও চিন্তিত হইয়া

পড়িলেন। তাঁহারা আসিয়াছিলেন আবুসুফিয়ানের নিরস্ত্র কাফেলাকে আক্রমণ করিতে।

কিন্তু সে কাফেলা কোথায় মিলাইয়া গেল, তদস্থলে দেখা গেল সশস্ত্র এক কোরেশ

বাহিনী। এর জন্য ঠিক রসূলুল্লাহ্ প্রস্তুত হইয়া আসেন নাই। এখন বাধ্য হইয়াই তাহাকে

এই কঠিন বাস্তবের সম্মুখীন হইতে হইল। কোরেশবাহিনীর মুকাবেলা করা ছাড়া উপায় 

বা কি ছিল? শক্র ত এখন ঘাড়ের উপর চড়িয়া বসিয়াছে। রসূলুল্লাহ্ নেতৃস্থানীয়

সাহাবাদিগের সহিত পুনরায় পরামর্শ করিলেন। তিনি দেখিলেন ভক্তবৃন্দ পূর্বের

প্রতিজ্ঞায় অটল রহিয়াছেন। আল্লাহর জন্য, রসূলের জন্য, ইসলামের জন্য প্রত্যেকেই

প্রাণ দিতে প্রস্তুত। রসূলুল্লাহ্ দ্বিগুণ উৎসাহে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইলেন।

শুক্রবার প্রভাত হইতে না হইতেই বেলালের কণ্ঠে ফজরের আযান ধ্বনিত হইল ।

মুসলমানেরা কাতারবন্দী হইয়া রসূলে করিমের এমামতিতে নামায পড়িলেন। নামাযাতে

হযরত যুদ্ধের জন্য সকলকে প্রস্তুত হইতে আদেশ দিলেন। যেখানে যাহাকে মােতায়েন

করা দরকার করিলেন । যাহাকে যে উপদেশ দিবার, দিলেন। মুসলিম সৈন্য প্রান্তরভূমি

সম্মুখে রাখিয়া একটি অনুচ্চ পর্বত গাত্রে স্থান নিলেন। পানির ঝর্ণাটি তাঁহাদের

অধিকারে রহিল ।

কোরেশ সৈন্য প্রান্তরে ব্যুহ রচনা করিল । বিচিত্র বর্ণের পােশাক ও বর্মে সুসজ্জিত

হইয়া তাহারা কাতারে কাতারে দাঁড়াইয়া গেল।

যুদ্ধ আসন্ন জানিয়া রসূলুল্লাহ্ আপন শিবিরে প্রবেশ করিলেন । তথায় গিয়া আল্লাহ্র

ধ্যানে মগ্ন হইলেন। এই সংকট মুহূর্তে জীবনের চরম এবং পরম বন্ধুর স্মরণ লইলেন।

প্রাণের সকল আবেগ মিশাইয়া মােনাজাত করিলেন ঃ “হে আমার প্রভু, আমার সহিত

তুমি যে ওয়াদা করিয়াছিলে তাহা পূর্ণ কর। হে প্রভু এই মুষ্টিমেয় সত্যের

সৈনিকদলটিকে তুমি কি বাঁচাইয়া রাখিবে না? ইহারা যদি আজ নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়, তবে

দুনিয়ায় তােমার নামের মহিমা প্রচার বন্ধ হইয়া যাইবে।" বলিতে বলিতে হযরত

একেবারে ভাবাবেগে তন্ময় হইয়া পড়িলেন। তাহা দেখিয়া আবুবকর আর স্থির থাকিতে

পারিলেন না। বলিলেন ঃ হযরত যথেষ্ট হইয়াছে। আল্লাহ্ নিশ্চয় আপনার প্রার্থনা পূর্ণ

করিবেন।

এই প্রার্থনার উত্তরে আল্লাহ্ তাঁহার রসূলকে এই আশ্বাসবাণী শুনাইলেন ও

“ন্যায়বানদিগকে সুসংবাদ দাও। নিশ্চয়ই প্রভু বিশ্বাসীদিগের নিকট হইতে

শক্রদিগকে দূরে রাখিবেন, কারণ আল্লাহ্ অবিশ্বাসীদিগকে ভালবাসেন না।”

(২২ ও ৩৮)

হযরত উৎফুল্ল হইয়া বাহিরে আসিলেন। আবুবকরকে ডাকিয়া তাহাকে এই সংবাদ

দিলেন এবং আল্লাহর সেই প্রতিশ্রুতির বাণী জোরে ঘােষণা করিতে লাগিলেন ?

“শীঘ্রই শত্রুদল ছিন্ন ভিন্ন হইয়া পলায়ন করিবে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এই নিয়তি।

শত্রুদের পক্ষে ইহা অত্যন্ত মারাত্মক ও ভয়াবহ হইবে।”২৫

(৫৪ ও ৪৫-৪৬)

ওদিকে আবুযহল মুসলমানদিগের সংখ্যা নির্ণয় করিবার জন্য ওমায়ের নামক

জনৈক অশ্বারােহীকে আদেশ দিল। ওমায়ের দ্রুতবেগে ঘােড়া ছুটাইয়া মুসলমানদিগকে

প্রদক্ষিণ করিয়া আসিয়া বলিল ও মুসলমানেরা সংখ্যায় তিন শতের বেশি হইবে না।

শুনিয়া আবুযহল নিশ্চিত বিজয়গর্বে একেবারে অধীর হইয়া উঠিল। কালবিলম্ব না করিয়া সে যুদ্ধারম্ভের আদেশ দিল ।

যুদ্ধ আরম্ভ হইল। কোরেশ শিবির হইতে রণভেরী বাজিয়া উঠিল । তখনকার রীতি

অনুসারে প্রথমে যুগ্মযুদ্ধ আরম্ভ হইল। কোরেশদিগের মধ্য হইতে ওবা, তাহার ভ্রাতা,

শায়বা এবং পুত্র অলিদ বাহির হইয়া আসিয়া আস্ফালন করিতে করিতে বলিতে

লাগিল ঃ “ওরে কাপুরুষ মুসলমানগণ কার এমন বুকের পাটা; আয় ত দেখি। যুদ্ধ কারে

বলে একবার দেখে যা এখানে।”

এই আহ্বান শুনিয়া আনসারদিগের মধ্য হইতে তিনজন বীর লাফাইয়া উঠিলেন ।

কিন্তু মহানুভব রসূলুল্লাহ্ তাহাদিগকে নিরস্ত করিলেন। তিনি ভাবিলেন, প্রথমেই যদি

আনসারগণ যুদ্ধে নামে এবং যদি তাহাদের কেহ নিহত হয়, তবে লােকে বলিবে

মােহাজেরদিগকে নিরাপদে রাখিয়া হযরত আনসারদিগের দ্বারাই যুদ্ধ চালাইতেছেন।

এই ভাবিয়া তিনি আপন পরমাত্মীয় হামজা, ওবায়দা ও আলিকে আহবান করিলেন।

আদশেক্রমে তৎক্ষণাৎ বীরত্রয় যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন। ওবার সহিত হামজার,

শায়বার সহিত ওবায়দার এবং অলিদের সহিত আলির যুদ্ধ আরম্ভ হইল। মুহূর্ত মধ্যে

বীরকেশরী আলির এক আঘাতেই অলিদের শির ভূলুণ্ঠিত হইয়া পড়িল। তদৃষ্টে ওবা

অধিকতর ক্ষিপ্ত হইয়া বিপুল বলে হামজাকে আক্রমণ করিল; কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই

হামজা তাহাকে জাহান্নামে পাঠাইয়া দিলেন। পঁয়ষট্টি বৎসর বয়স্ক ওবায়দাও শায়বাকে

নিহত করিলেন বটে কিন্তু তরবারির আঘাতে তিনিও গুরুতররূপে আহত হইয়া ধরাশায়ী

হইলেন এবং অল্পক্ষণ পরেই শাহাদৎ লাভ করিলেন ।

ওবাকে এত শীঘ্র নিহত হইতে দেখিয়া কোরেশগণ স্তম্ভিত হইয়া গেল। দ্বন্দ্বযুদ্ধে

কোন ফল হইবে না ভাবিয়া তাহারা সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের আক্রমণ করিল ।

এদিকে মুসলমানেরাও বিজয়ের প্রথম সূচনায় অধিকতর অনুপ্রাণিত হইয়া দ্বিগুণ উৎসাহে

শত্রু-নিপাতে অগ্রসর হইলেন।

তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হইল। অস্ত্রের ঝন্‌ঝনায় ও সৈনিকদের রণহুঙ্কারে বদর প্রান্তর

মুখরিত হইয়া উঠিল ।

প্রচণ্ড বেগে যুদ্ধ চলিতেছে। দূর হইতে হযরত এই যুদ্ধের ভীষণতা লক্ষ্য করিয়া

স্থির থাকিতে পারিলেন না; পুনরায় শিবিরাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া কাতরকণ্ঠে প্রার্থনা

করিলেন ঃ “হে আমার প্রভু, আমার সহিত তুমি যে ওয়াদা করিয়াছিলে তাহা তুমি

পূর্ণ কর।”২৬

মুসলিম বীরদল তখন প্রবল বিক্রমের সঙ্গে যুদ্ধ করিতেছেন। দুর্বার গতিতে তাহারা

ব্যুহ ভেদ করিয়া শত্ৰুদিগকে নাস্তানাবুদ করিয়া চলিয়াছেন। এক একজন বীর চার

পাঁচজন শত্রুকে নিপাত করিয়া তবে শহীদ হইতেছেন।

এই সময়ে মাে’আজ ও আবদুল্লাহ নামক দুইজন মুসলিম তরুণ আপন ত্যাগ ও

অসামান্য বীরত্ব দ্বারা এই যুদ্ধকে আশু পরিসমাপ্তির দিকে আগাইয়া দিলেন। আবু যহলকে হত্যা করিবার জন্য তাঁহারা জীবন পণ করিয়া অগ্রসর হইলেন। আবুযহল তখন

ব্যুহ বেষ্টিত হইয়া অবস্থান করিতেছিল। যুবকদ্বয় বিদ্যুৎগতিতে সেই ব্যুহ ভেদ করিয়া

অতর্কিতে আবুযহলকে আক্রমণ করিলেন। মাে’আজের এক আঘাতে আবুহলের একটি

পদ ছিন্ন হইয়া গেল। বাধ্য হইয়া সে ভূতলশায়ী হইল। পিতার এই মারাত্মক বিপদ

দেখিয়া ইকরামা ছুটিয়া আসিয়া মাে’আজকে আঘাত করিল; সেই আঘাতে মাে’আজের

একটি বাহু ছিন্ন হইয়া ঝুলিতে লাগিল। মাে’আজ দেখিলেন তাঁহার আপন বাহুই তাঁহার

শত্রু হইয়াছে। তৎক্ষণাৎ তিনি দোদুল্যমান বাহুটিকে পদতলে চাপিয়া ধরিয়া এমনভাবে

ঝটকা টান দিলেন যে বাহুটি ছিন্ন হইয়া ভূতলে পড়িয়া গেল। তখন মাে'আজ

স্বচ্ছন্দচিত্তে অপর হস্ত দ্বারা তরবারি চালনা করিতে লাগিলেন। মাে’আজের এই

শােচনীয় অবস্থা দেখিয়া আবদুল্লাহ্ তৎক্ষণাৎ তাঁহার পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইলেন ।

আবুযহল তখনও জীবিত ছিল। আবদুল্লাহ্র এক আঘাতে তাহার ছিন্নমস্তক লুটাইয়া

পড়িল ।

আবুহলের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কোরেশ সেনাদল ছত্রভঙ্গ হইয়া পলায়ন করিতে

আরম্ভ করিল। মুসলিমগণ সাফল্যের সূচনায় দ্বিগুণ উৎসাহিত হইয়া কোরেশদিগের

পশ্চাদ্ধাবন করিলেন। অনেককে নিহত করিলেন, অনেককে বন্দী করিলেন। মুসলিমগণ

ইচ্ছা করিলে এই সুযােগে আরও বহু শত্রুকে হত্যা করিতে পারিতেন, কিন্তু প্রেম ও

করুণায় মূর্ত ছবি মুহম্মদ। বাহিরে কঠোর হইলেও অন্তর তাহার হতভাগ্য মানুষের

বেদনায় কাঁদিয়া ফিরিতেছিল। তৎক্ষণাৎ তিনি আদেশ দিলেন ঃ উহাদিগকে মারিও না ।

বেচারাদের অনেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে আসিয়াছে।

আল্লাহ্র এ কী খেলা । রসূলুল্লাহ্ কী করিতেই বা আসিলেন আর কীই বা করিলেন।

আসিয়াছিলেন বদর সীমান্তে টহল এবং বিশেষ করিয়া সিরিয়া হইতে প্রত্যাগমনরত আবু

সুফিয়ানের কাফেলাকে আক্রমণ করিতে, সেই হিসাবে ৩১৩ জনের স্বেচ্ছাবাহিনীই

যথেষ্ট ছিল। কিন্তু কোন অদৃশ্য শক্তির ইঙ্গিতে আবুসুফিয়ান সমুদয় অস্ত্রপাতি ও

সাজসরঞ্জাম লইয়া নির্বিঘ্নে মক্কায় গিয়া পৌছিল, আর অন্য পথ দিয়া ইসলামের মারাত্মক

শক্রগুলি মদিনায় রসূলুল্লাহর আয়ত্তের মধ্যে আসিয়া হাজির হইল। আবুসুফিয়ানের দল

আবুহলের সহিত মিশিতে পারিল না। আল্লাহ্ যেন সুকৌশলে দুই দলকে বিচ্ছিন্ন

করিয়া রাখিয়া দিলেন। পঞ্চাশ হাজার টাকার অস্ত্রশস্ত্র ও রসদপত্র তাই বিফলে গেল ।

দুই দল একযােগে আসিলে বদর যুদ্ধের ইতিহাস হয়ত অন্যরূপে লিখিতে হইত।২৭

বদর-যুদ্ধে কোরেশদের নিহত সংখ্যা ছিল ৭০, বন্দী সংখ্যাও ছিল ৭০।

-হযরতের

মুসলমানদিগের নিহত-সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪। যে কয়জন কোরেশ নেতা আঁ-

প্রধান শত্রুরূপে এতকাল তাঁহার বিরুদ্ধে শক্রতা সাধন করিয়া আসিতেছিলেন, তাহাদের

অধিকাংশই এই যুদ্ধে প্রাণ হারাইল। বহু অস্ত্রশস্ত্র ও রসদপত্রও মুসলমানদিগের

হস্তগত হইল ।

কোরেশদিগের পলায়নের সঙ্গে সঙ্গে বদর-প্রান্তর পুনরায় শান্ত হইল। সত্যের বিজয়ে এবং মিথ্যার পরাজয়ে সারা প্রকৃতি যেন উৎফুল্ল হইয়া উঠিল ।

বদর যুদ্ধ ইতিহাসে এক যুগপ্রবর্তক ঘটনা। যে সমস্ত মুসলিম বীর বদরে যুদ্ধ

করিতে আসিয়াছিলেন, পরবর্তীকালে তাঁহারা আরও অনেক বড় বড় যুদ্ধে অংশগ্রহণ

করিয়াছিলেন, অনেক দেশও তাঁহাদের দ্বারা বিজিত হইয়াছিল; কিন্তু সেসব জয়

গৌরবকে কোন মূল্য না দিয়া বদর যুদ্ধে জড়িত থাকাকেই তাঁহারা অধিকতর সৌভাগ্য

ও গৌরব বলিয়া মনে করিতেন। ইরাকের শাসনকর্তা, কুফা নগরীর স্থাপয়িতা, পারস্য

বিজয়ী মহাবীর সা’দ অশীতিবর্ষ বয়সে মরণশয্যায় শায়িত অবস্থায় বলিয়াছিলেন ?

“বদর যুদ্ধে পরিহিত বর্ম আমাকে পরাইয়া দাও, এই বেশে মরিব বলিয়া আমি উহা

এতদিন সযত্নে তুলিয়া রাখিয়াছি।” বাস্তবিকই বদর যুদ্ধের গুরুত্ব এবং গৌরব মিথ্যা

নহে। মক্কা বিজয়ের ইহাই প্রথম পদক্ষেপ। ইসলামের ইতিহাস এখান হইতে মােড়

ফিরিয়াছে। এতদিন সে ছিল নিরীহ; এখন সে হইল নির্ভীক। এতদিন সে ছিল শান্ত ও

সংযত; এখন সে হইল দুর্বার, প্রাণমাতাল ও গতিশীল। আল্লাহতায়ালা এইজন্য বদর

বিজয়ের দিনকে মুক্তির দিন’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ত্যই ইহা মুক্তির দিন ।

বিধর্মীরা ইসলামকে অন্ধকারের বেড়াজালে শৃংখলিত করিবার জন্য চেষ্টা করিয়াছিল,

কিন্তু ইসলাম সকল বন্ধন ছিন্ন করিয়া এইদন বিজয়ীর বেশে বাহির হইয়া আসিয়াছে।

বস্তুত বদর যুদ্ধের উপর অনেক কিছু নির্ভর করিতেছিল। হযরত যদি এই যুদ্ধে

জয়লাভ করিতে না পারিতেন তবে কোরেশগণ ত মদিনা আক্রমণ করিতই, অধিকন্তু

নগরের পৌত্তলিক, ইহুদী, নাসারা ও মুনাফিকগণও তাহাদের সহিত যােগ দিত। এইরূপ

বহু বিপদের সম্ভাবনা হইতেই ইসলাম সেদিন মুক্তি পাইয়াছে।

পক্ষান্তরে বদর বিজয়ে মুসলমানগণ এক নূতন জীবনের সন্ধান পাইল। তাহাদের

মধ্যে যে অসীম শক্তি ও সম্ভাবনা লুকাইয়া আছে, সংখ্যাগুরু শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াও

যে তাহারা জয়ী হইতে পারে, তাহারা যে দুর্বার, দুর্দমনীয়, বিপদে যে আল্লাহ এবং

তাঁহার রসূল তাহাদের সহায়, এই বিশ্বাস তাহাদের মনে বদ্ধমূল হইয়া গেল। অন্তরে

অন্তরে তাহারা বুঝিতে পারিল ইসলাম আল্লাহর মনােনীত ধর্ম আর হযরত মুহম্মদ

সত্যসত্যই আল্লাহর প্রেরিত রসূল । হযরত এতদিন যে দাবী করিয়া আসিতেছিলেন এবং

যে আশার বাণী শুনাইতেছিলেন, বদর যুদ্ধে তাহার সত্যতা প্রমাণিত হইল। এক নূতন

মনােবল ও সামরিক বিজয়ে মুসলমানদিগের অন্তর ভরিয়া গেল।


Comments

Popular posts from this blog

২০/৩০ মিনিটের বিনিময়ে 3000/8000টাকা

Crypto currency mining

Zakaria Al Hasan IELTS Passed the test